ইসলাম শ্রীলঙ্কায় পৌঁছেছিল সেই আরব বণিকদের হাত ধরে, যাঁরা মসলা, রত্ন আর দারুচিনির খোঁজে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিতেন। এক হাজার বছরেরও বেশি পরে আজ প্রায় প্রতি দশজন শ্রীলঙ্কানের একজন মুসলিম। এই সম্প্রদায়ে আছেন মূর, যাঁরা মূলত সেই বণিকদের বংশধর, আর আছেন শ্রীলঙ্কান মালয়রা। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা অতিথিদের জন্য এই ঐতিহ্য শ্রীলঙ্কাকে এক আন্তরিক গন্তব্য করে তোলে, যেখানে ঐতিহাসিক মসজিদ, সুফি দরগাহ আর প্রায় সর্বত্র হালাল খাবার মেলে।
যে মসজিদগুলো দেখার মতো
জামি উল-আলফার মসজিদ, কলম্বো
ব্যস্ত পেট্টা বাজারে জামি উল-আলফার মসজিদ কলম্বোর সবচেয়ে পরিচিত স্থাপনাগুলোর একটি। ১৯০৯ সালে নির্মাণ শেষ হওয়া এই মসজিদ লাল-সাদা ডোরাকাটা ইটে মোড়া, তাই সবাই একে লাল মসজিদ বলে। নামাজের সময় ছাড়া শালীন পোশাকে দর্শনার্থীদের স্বাগত জানানো হয়। নারীরা একটি স্কার্ফ সঙ্গে রাখুন।

কেচিমালাই মসজিদ, বেরুওয়ালা
উপকূলীয় শহর বেরুওয়ালার একটি অন্তরীপে অবস্থিত কেচিমালাই মসজিদ সেই জায়গার কাছে বলে মনে করা হয়, যেখানে প্রথম আরব বণিকরা নেমেছিলেন। এটি দ্বীপের প্রাচীনতম মুসলিম স্থানগুলোর একটি, আর সূর্যাস্তের সময় পাথুরে কিনারায় সাদা মসজিদটি অত্যন্ত শান্ত দেখায়। বেরুওয়ালা তার পুরোনো রত্ন ব্যবসার জন্যও পরিচিত।
দেওয়াতাগাহা মসজিদ, কলম্বো
কলম্বোর টাউন হলের কাছে দেওয়াতাগাহা মসজিদে একজন শ্রদ্ধেয় সাধকের মাজার আছে, যেখানে নানা ধর্মের মানুষ প্রার্থনা ও মানত করতে আসেন।
সুফি দরগাহ ও পবিত্র পাহাড়
দফতর জিলানি, বালাঙ্গোডার কাছে
বালাঙ্গোডার কাছে পাহাড়ের উঁচুতে এক পাথুরে গুহায় অবস্থিত দফতর জিলানি ঐতিহ্য অনুযায়ী মহান সুফি সাধক হজরত আবদুল কাদির জিলানির সঙ্গে যুক্ত, যিনি এখানে ধ্যান করেছিলেন বলে মনে করা হয়। বার্ষিক উৎসবে এখানে বহু তীর্থযাত্রী আসেন, আর পাহাড়ি খাদের মাঝে জায়গাটি অসাধারণ সুন্দর।
আদম শৃঙ্গ (শ্রী পাদ)

অনেক শ্রীলঙ্কান মুসলিম বিশ্বাস করেন আদম শৃঙ্গের চূড়ার পদচিহ্নটি হজরত আদম (আ.)-এর, আর বৌদ্ধ ও হিন্দুরা একে বুদ্ধ ও শিবের সঙ্গে যুক্ত করেন। মহান পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৪ সালে এতে আরোহণ করে এই তীর্থযাত্রার বর্ণনা লিখে গেছেন। সূর্যোদয়ের সময় চূড়ায় পৌঁছাতে সাধারণত রাতে আরোহণ করা হয়, মূলত ডিসেম্বর থেকে মে মাসের মধ্যে।
হালাল খাবার ও মুসলিম রান্না
- বিরিয়ানি: শ্রীলঙ্কান "বুরিয়ানি" উৎসবের প্রিয় খাবার, প্রায়ই সেদ্ধ ডিম আর চাটনির সঙ্গে পরিবেশিত হয়।
- কোট্টু: কুচানো রুটি মাংস ও মসলার সঙ্গে ভেজে তৈরি, দ্বীপের প্রিয় স্ট্রিট ফুড।
- ওয়াটালাপ্পান: গুড় আর নারকেলের ঘন পুডিং, ঈদে অপরিহার্য।
- মালয় পদ: নাসি গোরেং আর টক-মিষ্টি মালয় আচার চেখে দেখুন।
- কোথায় খাবেন: কলম্বোর পেট্টা, মারাদানা ও দেহিওয়ালায় অনেক মুসলিম মালিকানাধীন রেস্তোরাঁ আছে। অন্য জায়গায় মাংস হালাল কিনা জিজ্ঞেস করে নিন। পর্যটন এলাকায় সাধারণত হালালই হয়।
শ্রীলঙ্কায় রমজান ও ঈদ
রমজানে মসজিদগুলো তারাবির নামাজে ভরে যায়, আর ইফতারের পর কলম্বোর মুসলিম পাড়াগুলো জেগে ওঠে। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা শ্রীলঙ্কায় সরকারি ছুটি, আর পরিবারগুলো বিরিয়ানি ও ওয়াটালাপ্পানের থালা নিয়ে একে অপরের বাড়িতে যায়। রমজানে ভ্রমণ সহজ, কারণ যাঁরা রোজা রাখছেন না তাঁদের জন্য রেস্তোরাঁ খোলা থাকে।
ব্যবহারিক পরামর্শ
- বাংলাদেশ থেকে: শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনস ও ফিটসএয়ার ঢাকা থেকে কলম্বো সরাসরি ফ্লাইট চালায়। বাংলাদেশিদের ETA ফি প্রায় ২০ মার্কিন ডলার।
- পাকিস্তান থেকে: শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনস করাচি ও লাহোর থেকে সরাসরি কলম্বো যায়। পাকিস্তানি পাসপোর্টধারীরা বর্তমানে বিনামূল্যে ETA পান।
- নামাজ: প্রায় প্রতিটি শহরেই মসজিদ আছে। জুমার নামাজে ভালো উপস্থিতি থাকে।
- পোশাক: শালীন পোশাক সব জায়গায় সম্মান পায় এবং সব ধর্মের পবিত্র স্থানে আবশ্যক।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
মুসলিম ভ্রমণকারীদের জন্য কি শ্রীলঙ্কা ভালো?
হ্যাঁ। প্রায় প্রতি দশজন শ্রীলঙ্কানের একজন মুসলিম, বেশিরভাগ শহরে মসজিদ আছে, আর হালাল খাবার সহজলভ্য।
অমুসলিমরা কি কলম্বোর লাল মসজিদে যেতে পারেন?
হ্যাঁ, নামাজের সময় ছাড়া এবং শালীন পোশাকে। নারীরা চুল ঢেকে রাখুন, আর সবাই জুতা খুলে প্রবেশ করুন।
আদম শৃঙ্গে তীর্থযাত্রার মৌসুম কখন?
মূল মৌসুম মোটামুটি ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত। সূর্যোদয়ের সময় চূড়ায় পৌঁছাতে বেশিরভাগ মানুষ ভোররাতে আরোহণ শুরু করেন।
বাংলাদেশিদের কি শ্রীলঙ্কার ভিসা লাগে?
হ্যাঁ। ভ্রমণের আগে eta.gov.lk-এ ETA-র আবেদন করুন। সার্ক নাগরিক হিসেবে ফি প্রায় ২০ মার্কিন ডলার।


